Read more

মুসলিমদের জন্য রমজান মাসে করণীয়

ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে রোজা তৃতীয় পাঁচটি স্তম্ভের গুরুত্ব মর্যাদার দিক দিয়ে রোজাদারের অবস্থান ও মর্যাদা সবার ওপরে বেহেশতেও রোজাদারদের পৃথক মর্যাদার ব্যবস্থা থাকবে প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, রোজাদাররা রাইয়ান দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহ্ সাক্ষাৎ লাভের আশীর্বাদে পুরস্কৃত হবে’(বুখারি) ইমাম গাজ্জালি যথার্থই বলেছেন, সব এবাদতই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের জন্য, তবুও মার্যাদার উচ্চতায় রোজা পবিত্র কাবাগৃহের ন্যায় প্রাধান্য রাখে, যদিও সমস্ত ভূপৃষ্ঠই আল্লাহ্ তাআলার সৃষ্টি

হিজরী বার মাসের মধ্যে গুরুত্বের দিক দিয়ে অন্যতম মাস হচ্ছে রমজান। রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের পয়গাম নিয়ে হাজির হয় প্রতি বছর এই রমজান মাস। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এ মাসের বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনা করা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর জন্য সর্বোত্তম মাস হলো রমজান আল্লাহপাক স্বয়ং এ মাসের সম্মানের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন, ‘রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়াত এবং সুপথ প্রাপ্তির সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর হক-বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী।’ (সূরা বাকারা: ১৮৫)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রমযান মাস আগমন করে তখন বেহেশতকে সাফাই করা অর্থাৎ নতুন বৎসরের জন্য নতুনভাবে সাজানো হয়। যখন রমযানের প্রথম রাত থেকেই মহান আল্লাহর আরশের নিচে সুগন্ধি হাওয়া প্রবাহিত হতে থাকে। সেই সুগন্ধি হাওয়ায় বেহেশতের বৃক্ষাদি সুন্দর রুপ ধারন করে ফুলপত্রগুলি দুলতে থাকে। ফুল, ফল, বৃক্ষাদির মর্মর ধ্বনি এতই সুমধুর হয় যে, মনে হবে  কখনও শুনা হয়নি। অতঃপর হুরদিগকে সজ্জিত করা হয়। তারা বেহেশতের মধ্যে একটি উচ্চস্থানে দন্ডায়মান হয়ে আওয়াজ করে বলতে থাকেম হে আল্লহা! তুমি আমাদের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি পূর্ণ কর। তারপর আবার হুরগন বলে, হে রিদোয়ান ! (বেগেশতের ভারপ্রাপ্ত ফেরেশতা ) ইহা কোন রাত্রি? তিনি বলেন, গে হুরগণ! ইহা রমযান মোবারকের রাত্রি। আজ উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য বেহেশতের দরজা খোলা । তখন আল্লাহ্ তায়ালা হুকুম করবেন! রমযান মাস ভরে উম্মতের মোহাম্মদীর জন্য বেহেশতের দরজা খোলা রাখ আর দোযখের দরজা বন্ধ করে রাখ। আবার আল্লাহ্ জিব্রাঈলকে নির্দেশ করেনম হে জিব্রাঈল! পৃথিবীতে গিয়ে ইবলীসকে বন্দী কর এবং রমযান ভরে জিঞ্জির দ্বারা তাকে বেঁধে রাখ।
পবিত্র হাদিস শরীফে উল্লেখ রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, মুসলমানদের জন্যে রমজানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি আর মুনাফিকদের জন্য রমজানের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর মাসও আসেনি কারণ মুমিনগণ রমজানে গোটা বছরের ইবাদতের শক্তি পাথেয় সংগ্রহ করে আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের অলসতা দোষ অন্বেষণ করে মাস মুমিনদের জন্য গনীমত (ইবনে খুযাইমা: ১৮৮৪)
রমজান মাস হলো আমল বহু গুণে বৃদ্ধি হওয়ার মাস মাসের কদরের এক রাতের ইবাদতের মুল্য হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম (সূরা কদর: ) শুধু রাতই নয়, বরং মাসের প্রতিটি ইবাদতই বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়
এমন কিছু ইবাদত রয়েছে যেগুলো পালনে বাধ্যবধকতা নেই বা আবশ্যক নয়। সেগুলোকে আমরা ঐচ্ছিক ইবাদত হিসেবে জানি। যাহা শরীয়তের পরিভাষায় নফল নামে অভিহিত। যদিওবা নফল ইবাদত বাধ্যতামূলক নয় এবং নফল ইবাদত আদায় না করলে বান্দা কোনো শাস্তি তিরস্কার পাবে না,  যা আদায় করলে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে রয়েছে বিশাল পুরস্কার যার মধ্যে নামাজ, রোজা, হজ, কোরবানি, দান-খয়রাত ইত্যাদি নফল হতে পারে কোরআন তিলাওয়াত করা বা মনোযোগের সঙ্গে শোনা উৎকৃষ্ট একটি নফল ইবাদত

যদিও নফল ইবাদত বাধ্যতামূলক নয়, নফল ইবাদত আদায় না করলে বান্দা কোনো শাস্তি তিরস্কার পাবে না, তবুও গুরুত্বের সঙ্গে নিয়মিত কিছু কিছু নফল ইবাদত করা দরকার নফল ইবাদতের যদি দরকারই না থাকত, তবে নবীয়ে আকরাম (সা.) রাতে এত দীর্ঘ নফল নামাজ কেন পড়তেন যে তার পবিত্র পা ফুলে যেত? তিনি কেন প্রায় সারা বছর রোজা রাখতেন? যে বান্দা ফরজ ইবাদত ঠিক রেখে সাধ্যমতো নফল ইবাদত আদায়ের চেষ্টা করে, সে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বাড়তি কিছু সুবিধা দুনিয়ায়ও পাবে, আখিরাতেও পাবে দুনিয়ায় সে অফুরন্ত বরকত পাবে আখিরাতে তার গুনাহগুলো সহজেই মার্জিত হবে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, মহান আল্লাহ বলেছেন_ যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে শত্রুতা করবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধের ঘোষণা দিলাম বান্দা যেসব আমলের দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন করে থাকে, তার মধ্যে ফরজ আমলগুলো আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় আর নফল ইবাদত দ্বারা বান্দা আমার এত বেশি কাছের হয়ে যায় যে তখন আমি তাকে ভালোবাসি আমি তার কান হয়ে যাই, যা দ্বারা সে শোনে আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দ্বারা সে দেখে আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধরে আমি তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে হাঁটে সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, আমি তাকে তা দিই সে আমার আশ্রয় প্রার্থনা করলে আমি তাকে আশ্রয় দিই _সহিহ বোখারি :৬৫০২ নফল নামাজ সম্পর্কে এক হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১২ রাকাত নফল নামাজ পড়বে, আল্লাহতায়ালা তার জন্য জান্নাতে প্রাসাদ নির্মাণ করবেন আরেক হাদিসে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, হে আদম সন্তান! আমার জন্য দিনের শুরুতে চার রাকাত নামাজ পড়ো আমি দিনের শেষ পর্যন্ত তোমার সব কাজ সমাধা করে দেব নফল দান সম্পর্কে হাদিসে আছে, দান-খয়রাত আল্লাহর ক্রোধকে শীতল করে এবং অপমৃত্যু প্রতিরোধ করে
নফল ইবাদত যদিও সারাবছর করা যায় বা করতে হয়, তবুও রমজান মাসে নফল ইবাদতের গুরুত্ব অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি নবী করিম (সা.) রমজান মাসের গুরুত্ব করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিতে গিয়ে এক দীর্ঘ হাদিসে ইরশাদ করেছেন, মাসে যে ব্যক্তি নফল আদায় করবে, সে অন্য মাসের ফরজ আদায়ের সমতুল্য সওয়াব পাবে
আরেক হাদিসে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, রমজান মাস এসে গেছে অতএব, যারা গুনাহগার, তারা থেমে যাও গুনাহ ছেড়ে দাও আর যারা ইবাদতগুজার, তারা আগের চেয়ে বেশি করে ইবাদত করো ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, ফরজ ইবাদত বেশি করে করার সুযোগ নেই ফরজের পরিমাণ সুনির্দিষ্ট বেশি করে করা যায় একমাত্র নফল ইবাদত তাই হাদিস দ্বারা পরিষ্কার নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে, রমজান মাসে সম্ভাব্য সব নফল ইবাদত অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি করে করা উচিত বিশেষত, দান-খয়রাত, নামাজ, জিকির, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ, এস্তেগফার, দোয়া ইত্যাদি আমলে বেশি সময় দেওয়া প্রত্যেক রোজাদারের জন্যই শ্রেয়